রূপাদের নিয়তি বদলাবে কবে ?

BM REZAUL KARIM
মুহূর্তের খবর, ঢাকা

তারিখ: ২০১৭-০৯-০৪ | সময়: ০৯:০৭:২৮

....

রূপোলি চাঁদের আলতো ছোঁয়ায় রূপার রঙিন স্বপ্ন রাঙা প্রভাতের আলোতে চকমক করার সৌভাগ্য পায়নি । হায়েনার লোলুপ দৃষ্টি রূপার স্বপ্নগুলোকে দুমড়ে-মুচড়ে তাকে ঠেলে দিয়েছে মানব সভ্যতার অন্ধকার গলিতে ! সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা কীটদের উৎপাতে রূপারা আজও ইজ্জত-আভ্রু ও জীবনের নিরাপত্তা পায়নি । ঘরে-বাইরে রূপাদের অবস্থান সেই আদিম বর্বরযুগের চাইতে খুব বেশি বদলেছে বলে দাবী করার নৈতিক যোগ্যতা আজও পুরোমাত্রায় অর্জিত হয়নি । সভ্যতার উৎকর্ষ ঘটেছে বটে কিন্তু নরপশুদের বীভৎস থাবা আরও হিংস্র হয়েছে । চাকুরির পরীক্ষা শেষে স্বপ্নের জাল বুনতে বুনতে ঘরে ফেরার উদ্দেশ্য পথচলা মেয়েটির নিয়তি থমকে গেছে দ্রুতালয়ে চলা বাসের মধ্যে ঘুমরে ওঠা আর্তচিৎকারে এবং অবশেষে পরিচয়হীন হয়ে নিথর দেহ নিক্ষেপিত হয়েছে গহীন অরণ্যে । রূপাদের স্বপ্নের সাথে রূপারাও এভাবে ঝড়ে যাবে আর সমাজ তাকিয়ে তাকিয়ে মৌন দর্শকের ভূমিকা পালন করবে-এভাবে আর কতকাল ? পাঁচ দানবের হিংস্র থাবায় ধর্ষিতা হয়েও জীবনে রক্ষা পায়নি মেয়েটি বরং বর্বোরোচিতভাবে ঘাড় মটকে হত্যা করে ছুড়ে ফেলা হয়েছে চলন্ত বাস থেকে । এসব জানার পরেও কোন সভ্যতায় দাঁড়িয়ে আছি তা বিধৃত করতে খুব বেশি পন্ডিত হওয়ার দরকার পড়ে ?

 

....

ভারতের অভয়া কান্ডের পর গোটা বিশ্ব বিবেক নড়েচড়ে বসেছিল । সে ঘটনায় ঘৃণা জানাতে জানাতেও অন্তত স্বান্তনা খুঁজছিলাম, আমাদের জন্মভূমিতে ওমন পাষন্ডদের দেখা মেলেনা । অথচ প্রশান্তি ভেঙ্গে চুড়মাড় হয়ে গেল । গর্বের ঔদার্য সংকীর্ণ হতে হতে সে মাত্রায় অবতীর্ণ হয়েছে যেখানে লজ্জাও আমাদের ক্রিয়াকান্ড দেখে লজ্জিত হয় । কতটা জঘণ্যতায় মেতেছি তার উপলব্ধি ততোটা কঠিন নয় বোধহয় নয়তো বাসের মধ্যে একটি মেয়ে ধর্ষিতা হতে পারে-এসব দৃষ্টান্ত দেখতে হবে কেন ? ধর্ষক ও হত্যাকারীদের মধ্যে যারা গ্রেফতার হয়েছে তাদের বয়স দেখে মনে হলো তাদের বেশ কয়েকজনের রূপার মত মেয়ে আছে নিশ্চয়ই । এসব মানুষদের সাথে আর মানুষের তুলনা করার সাধ্য নাই, নাই রুচিও বরং এদের সাথে জন্তু-দানবের তুলনা করলেও সেসব বিদ্রোহী হয়ে উঠবে । বর্বর হায়েনারাও এতোটা জঘন্য নয় যতোটা জঘন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে মানুষ নামের কতিপয় জানোয়ার । মানুষের সমাজে মানুষরূপী নপুংসকের দলের দ্বারা যা ঘটছে সেসব আর মানব সমাজের ক্রিয়াকলাপের সংজ্ঞাভূক্ত করা চলে না অথচ ঘটছে, হররোজ ঘটছে ।

....

আশা রাখি, এ হায়েনাদের বিচার হবে কিন্তু রূপার স্বপ্নের কী হবে ? ধর্ষণের বিচার হবে, হত্যার বিচার হবে কিন্তু স্বপ্ন হত্যার বিচার কে করবে, শাস্তি-ই বা কী হবে ? নানা জটিলতার পরেও অপরাধীরা দন্ড পাবে হয়ত কিন্তু বিচার শেষ হতে কতদিন লাগবে তার নিশ্চয়তা দেয়া চলে না । শঙ্কা থেকে যায়, আইনের ফাঁক গলিয়ে ধর্ষকরা আবার ধর্ষণ করার জন্য উম্মুক্ত হতে পারে ! এখানে সিঁধেল চোর, অখ্যাত ডাকাতকে পর্যন্ত মাঝে মাঝে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হয় কিন্তু এসব জঘন্য কালপিটদের কখনো ক্রসফায়ারে মারা হয়েছে তা শোনা যায়নি । অথচ এই সব নরপশুদের যদি প্রকাশ্যে শাস্তি দেয়া হত, পুরুষত্বের চিহ্ন কেটে দেয়া হত তবে আমাদের রূপারা নিরাপত্তা পেত । অন্তত ধর্ষিতা হয়ে জীবনহানীর ঘটনা দ্বিতীয়বার ঘটত বলে মনে হয়না । রূপাদের নিরাপত্তার সার্বিক প্রশ্ন অঁধরাই থেকে গেল, বোধহয় চির অঁধরা ।

...

নরপশুদের উৎপাতে শুধু বোনদের সামনে নয় বরং মায়ের সামনে দাঁড়াতেও লজ্জা হয় । চারদিকে কি হচ্ছে এসব ? কে রুখবে বর্বরদের ? রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষা কিংবা ধর্ম ? নরপিশাচদের পাশবিকতা দিনে দিনে বেড়েই চলছে । রাজনৈতিক ছত্রছায়া, অর্থের প্রভাব, দু’কেন্দ্রিক দুর্নীতির বিস্তার এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগত ত্রুটির কারনে ধর্ষিকের বদলে ধর্ষিতাকে পালিয়ে বেড়াতে হয় । বাহারি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছি বটে ! যখন নারী-পুরুষের সম্পর্ক বিশ্বাসের হওয়া আবশ্যক ছিল সে সম্পর্ককে আমরা শঙ্কা মার্কা সন্দেহের সম্পর্কে রূপায়ণ করেছি, দিয়েছি অনেকটা ভীতির খোরাক । জৈবিক চাহিদা পূরণে এখন মানুষ কুকুর-শুকরের চেয়েও জঘন্য পথে হাঁটছে । পরিণতি ভাবছেন ? সন্দেহ কেন্দ্রিক লৈঙ্গিক শত্রুতার কারনে যে দূরত্ব বাড়ছে তা যদি বিশ্বাস এবং নিরাপত্তার সূত্রে ঘোচানো না যায় তবে সমাজকে সভ্য মানুষের বাসযোগ্য রাখা মুশকিল হবে । রাষ্ট্রকে এসব পশুদের চিরতরে দমনের মাধ্যমে অনাচার দূর ও অবিশ্বাসের ঘাঁটি উচ্ছেদের ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে । অন্তত ধর্ষকদেরকে প্রকাশ্যে গুলি করে কিংবা ফাঁসিতে লটকিয়ে শাস্তির রীতি প্রবর্তন করতে না পারলে পুরুষ নারীর সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ হারাবে । সমাজকে মানুষের বাসযোগ্য করার জন্য বর্বর হায়েনামুক্ত সমাজ বিনির্মানে জোরদার অভিযান চালাতে হবে । অন্তত রূপারা যাতে স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে পারে সে ব্যবস্থাটুকু রাষ্ট্র করে দেবে বলেই বিশ্বাস । নারী-পুরুষ সহাবস্থানের মাধ্যমে বিশ্বাসপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ পাক । একপক্ষ আরেকপক্ষকে বিশ্বাস করার অবস্থানটুকু যাতে তৈরি হয় তার যথাযথ ভিত্তি রচিত হোক । নয়তো এখানে মানবিক বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী ।

....

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।





Comment Disabled

Comments