জেনে নিন হাড় ক্ষয়ের কারন ও চিকিৎসা সংক্রান্ত সবকিছু

NewsRoom Editor
মুহূর্তের খবর, ঢাকা

তারিখ: ২০১৪-১১-১৫ | সময়: ০৮:৪৯:২৩

মুহূর্তের খবর রিপোর্ট॥

মানবদেহের আট প্রকারের কোষের মধ্যে হাড় একটি। আপাতদৃষ্টে নিরেট কাঠামো মনে হলেও এটি জীবন্ত কোষ। আর তাই হাড়ের পুষ্টির জন্যেও প্রয়োজন রক্তের যথাযথ সরবরাহ। তাতে ব্যাঘাত ঘটলেই দেখা দেয় পুষ্টির অভাব, মারা যেতে থাকে হাড়ের কোষ। ধীরে ধীরে ভেঙে যেতে থাকে হাড়। উরুর উপরের অংশের হাড়েই এ ক্ষয় দেখা যায়। আর রক্তপ্রবাহের স্বল্পতার কারণে হাড়ের তরুণাস্থি ও জোড়ায় ক্ষয় দেখা দিলে তাকে বলা হয় এভাসকুলার নেকরোসিস বা সংক্ষেপে এভিএন। রোগটি অস্টিও নেকরোসিস, এসেপটিক নেকরোসিস বা ইসকেমিক নেকরোসিস নামেও পরিচিত। এভাসকুলার নেকরোসিস হতে পারে হাঁটু কিংবা গোড়ালির হাড়েও।

উন্নত বিশ্বে ২০-৫০ বছর বয়সের মানুষদের মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয় এভিএন রোগে।

 

এভাসকুলার নেকরোসিসের কারণ

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সুস্বাস্থ্যের অভাব কিংবা আঘাতজনিত কারণে এভিএন দেখা যায়। আছে আরও কিছু কারণ-

উরুর হাড়ের স্থানচ্যুতি বা ভাঙা: আঘাতের ফলে হাড়ের রক্ত সরবরাহ কমে গিয়ে এভিএন সৃষ্টি করে। যেসব রোগীর কোমরের হাড়ের স্থানচ্যুতি থাকে তাদের এভিএন-এ আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অন্যদের তুলনায় ২০ শতাংশ বা তারও বেশি বেড়ে যায়।

স্টেরয়েড: হাঁপানি (অ্যাজমা) বা শ্বাসকষ্ট, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা গেঁটে বাতের চিকিৎসায় দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘমেয়াদী স্টেরয়েডের ব্যবহারের ফলে ৩৫ শতাংশ রোগী আঘাতজনিত কারণ ছাড়াই এভাসকুলার নেকরোসিস বা এভিএন-এ আক্রান্ত হতে পারে। চিকিৎসকেদের ধারণা, স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ব্যবহারের ফলে শরীরের মেদ ভেঙে গিয়ে রক্তনালীতে জমা হয়। এতে রক্তনালী সরু হয়ে হাড়ে রক্ত সরবরাহ কমে যায়।

অতিরিক্ত অ্যালকোহল: অতিরিক্ত অ্যালকোহলও মেদ ভেঙে রক্তনালীতে জমা করে।

রোগ: রক্তজমাট, প্রদাহ ও ধমনীর রক্ত প্রবাহের ব্যাঘাতের ফলে হাড়ে রক্ত সরবরাহ কমে গিয়েও এভিএন হতে পারে।

এছাড়া বেশ কিছু রোগের কারণেও এভিএন দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে- উরুসন্ধির অসারতা, বাতজনিত ব্যথা, শিকল সেল ডিজিজ, রেডিয়েশন থেরাপি, ক্যামোথেরাপি, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ, গাউচার ডিজিজ এবং বিপাকজনিত কারণে শরীরে ক্ষতিকর মাত্রায় মেদ জমে যাওয়া, রক্তে বুদ বুদ তৈরি হওয়া।


লক্ষ্মণ

প্রাথমিক অবস্থায় এভিএন-এর কোনও লক্ষ্মণ ধরা পড়ে না। প্রথমদিকে আক্রান্ত হাড়ে চাপ লাগলে রোগী ব্যথা অনুভব করেন। এ সময় হিপ জয়েন্ট, কোমরের পেছনে ও পাশে ব্যথা হয়। রোগী দাঁড়ালে বা হাঁটলে কোমর থেকে উরু পর্যন্ত ব্যথা হয়। এভিএন-এর ব্যথা কখনোই হাঁটুর নিচে নামে না। এ পর্যায়ে সঠিক চিকিৎসা না হলে পর্যায়ক্রমে ব্যথা বাড়তে থাকে এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে সংযুক্ত জোড়ায় অস্টিও আর্থাইটিস হয়ে হাড় অনড় হয়ে যায় এবং রোগাী চলাচলে অক্ষম হয়ে পড়েন। কখনো কখনো কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর সময় নিয়ে আক্রান্ত হাড়ের জোড়া বিকল হয়ে যেতে দেখা যায়।


এভিএন-এর চিকিৎসা

প্রাথমিক অবস্থায় এমআরআই পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় জরুরি। রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর রোগীর বয়স ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনায় এভিএন-এর চিকিৎসা করা হয়। তবে আক্রান্ত স্থান ও রোগের জটিলতার ওপরই মূলত চিকিৎসা নির্ভর করে। রোগের পর্যায় বা ধাপের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসার ফলাফল। এভিএন প্রতিরোধ বা রোগ ঠেকিয়ে রাখা কিংবা বিলম্বিত করার কোনও কার্যকরী চিকিৎসা পদ্ধতি আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি।

এভিএন চিকিৎসার বেশ কয়েকটি ধাপ রয়েছে। এগুলো হলো- ক্র্যাচ ব্যবহার করে আক্রান্ত স্থানে কম চাপ দেওয়া ও ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহার, চলা-ফেরা কমিয়ে দেওয়া। বিলম্বিত রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে শারীরিক তৎপরতা কমিয়ে এভিএন নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। আর চূড়ান্ত পর্যায়ে অপারেশনের মাধ্যমে রোগীর অবস্থার উন্নতির চেষ্টা করা হয়।

অস্ত্রোপচার: এভিএন চিকিৎসায় অপারেশনের দ্বারস্থ হলেও সার্জনরা এখনও কোনও পদ্ধতিকে সার্বজনীন পদ্ধতি হিসেবে বেছে নিতে পারেননি। অপারেশনের ক্ষেত্রে (হাড় ভেঙে যাওয়ার আগে) হাড় প্রতিস্থাপন (বোন গ্রাফট) করে অথবা প্রতিস্থাপন না করে কোর ডিকম্প্রেশন পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আর বিলম্বিত পর্যায়ে (হাড় ভেঙে যাওয়া, ফিমোরাল হেড ডিফরমিটি অথবা জটিল অস্টিও আর্থাইটিসের ক্ষেত্রে) হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।

কোর-ডিকম্প্রেশন: গবেষকরা দেখেছেন, কোর-ডিকম্প্রেশনের ফলে হাড়ের অন্তঃচাপ কমে যায় এবং রক্তের সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। এতে হাড় ও জয়েন্টের ক্ষয় বন্ধ হয়। হাড় ভেঙে যাওয়ার আগে এভিএন-এর চিকিৎসা করালে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া যায়। কোর-ডিকম্প্রেশনের মাধ্যমে প্রচলিত চিকিৎসার তুলনায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত সফল চিকিৎসা সম্ভব হয়। ব্যথা নিরাময়ের জন্যও এই পদ্ধতি অত্যাধিক কার্যকর।

হাড়-প্রতিস্থাপন: এভিএনের ক্ষেত্রে হাড় প্রতিস্থাপন বা বোন গ্রাফটের ফলে হাড়ের ক্ষয় তুলনামুলক তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়।

অস্টিওটমি: আঘাতজনিত এভিএন-এর ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অস্টিওটমি কখনও কখনও সফল হতে দেখা যায়।

উরুসন্ধি প্রতিস্থাপন: বিলম্বিত বা দীর্ঘমেয়াদী এভিএনের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ রোগীর উরুসন্ধির প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হয়। যদিও দীর্ঘদিন উরুসন্ধির প্রতিস্থাপন ব্যথা নিরাময়ের জন্য চমৎকার ফলাফল দিলেও উরুসন্ধি প্রতিস্থাপনের পর রোগীকে নানাবিধ সমস্যা পোহাতে হয়। এরমধ্যে রয়েছে- হাড়ের স্থানচ্যুতি, হাড়ের ইনফেকশন, পা ছোট বড় হয়ে যাওয়া, স্নায়ুবিক আঘাত বা প্যারালাইসিস, সার্বক্ষণিক অস্থিরতা এবং হাড় খুলে যাওয়া। ফলে প্রথম অপারেশনের ৮-১০ বছর পর আবারো অপারেশনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে। আবার উরুসন্ধির প্রতিস্থাপন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় এই পদ্ধতি রোগীর জন্য বড় রকম আর্থিক চাপ বয়ে আনে।

কর্টিসন ইনজেকশন: সাময়িকভাবে এভিএন-এর ব্যথা কমানোর জন্য উরুসন্ধিতে সরাসরি কর্টিসন ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। প্রয়োগ পদ্ধতি, ব্যয় ও স্বল্পমেয়াদি কার্যকারিতার জন্য এই ইনজেকশন সাধারণত পরিহার করা হয়।

লেজার কোর-ডিকম্প্রেশন ও অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন: কোর-ডিকম্প্রেশন এর ক্ষেত্রে প্রযুক্তির নতুন আবিষ্কার লেজার কোর-ডিম্প্রেশন। এ পদ্ধতিতে লেজার রশ্মির মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী আক্রান্ত হাড়ে কোর বা ছিদ্র করা হয়। এতে হাড়ের অভ্যন্তরীণ চাপ কমে যায়। পরবর্তীতে এই ছিদ্রের ভিতর দিয়ে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন (বোনমেরু সেল রিপ্লেসমেন্ট) করা হয়। লেজার স্টিমুলেশনের ফলে হাড়ে দ্রুত নতুন রক্তনালী তৈরি হয়। এতে এভিএন আক্রান্ত স্থানে রক্তপ্রবাহ দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পায় এবং অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের ফলে সহজেই হাড়ের নতুন কোষ তৈরি হয়। এ কারণে কাটা-ছেড়াহীন লেজার কোর-ডিকম্প্রেশন পদ্ধতির মাধ্যমে এভিএন আক্রান্ত রোগী দ্রুত সুস্থ হন।

ঢাকায় ইনস্টিটিউট অব লেজার সার্জারি অ্যান্ড হসপিটাল লেজার কোর-ডিকম্প্রেশন পদ্ধতির এভিএন চিকিৎসা দেয়। এই হাসপাতালে ৪০ জন রোগীর ৬২টি হিপ জয়েন্টের অপারেশনের ওপর একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। অপারেশনের আগে ও পরে ‘হ্যারিস হিপ স্কোরস-এইচএইচএস (Harris Hip Score-HHS) এবং ‘ফিসেট অ্যান্ড অ্যালার্ট স্ট্যাজিং (Ficat & Arlet staging ) মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত গবেষণায় কোনও রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই এ পদ্ধতিতে ৪০.৩ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল (Excellent), ২১% রোগীর ক্ষেত্রে ভাল (Good), ২৯% রোগীর ক্ষেত্রে সন্তুষজনক (Fair) ফলাফল পাওয়া গেছে।

গবেষণাটি অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্ট আর্ন্তজাতিক সম্মেলনে সর্বপ্রথম সাদরে গৃহীত হয়। পরে জার্মান চিকিৎসকরাও এটাকে গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করেন। গবেষণাটি ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক লেজার সার্জারি সম্মেলনে বিশ্বের খ্যাতনামা লেজার বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সম্প্রতি এই গবেষণা কর্মটি মালয়েশিয়ান জার্নাল অব মেডিক্যাল অ্যান্ড বায়োলজিক্যাল রিসার্চ এবং এশিয়ার বিজনেস কনসোর্টিয়ামের এবিসিজার্নালস-এ প্রকাশিত হয়।

 

লেখক: ডা. মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী, এমবিবিএস, পিএইচডি

পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব লেজার সার্জারি অ্যান্ড হসপিটাল

ইমেইল:  myalibd@hotmail.com

মুহূর্তের খবর/২০১৪/অপ





Comment Disabled

Comments