বিপ্রতীপ: আমি আজও ভুলতে পারি না

NewsRoom Editor
মুহূর্তের খবর, ঢাকা

তারিখ: ২০১৫-০৪-১৮ | সময়: ০৬:২৩:১১

মুহূর্তের খবর রিপোর্ট॥

বিপ্রতীপ-১
সেই দিনটার কথা আমি আজও ভুলতে পারি না। ভুলতে পারি না, সেই ঠা ঠা অট্টহাসি। সেই ঘোলাটে চোখ। আর বজ্রবিদু্যতের মতো আৎচমকে আছড়ে পড়া সেই প্রশ্ন_'তোমাদের কি চলে?'
আমাদের দূর সম্পর্কের এই আত্দীয় মারা গেছেন। আমার বড় ফুপুর দেবর। সত্যি বলতে কি নিজের দাদির মৃতু্যতেও গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সময় হয়নি 'ভীষণ ব্যস্ত' এই আমার। সেই আমি ঠিকই ছুটে গেলাম ফুপুর দেবরের মৃতু্যতে শোক জানাতে, আমাদের পরিবারের প্রতিনিধি হয়ে। আসলে এর মধ্যে লুকিয়ে আছে পারিবারিক রাজনীতি। পৈত্রিকসূত্রে পাওয়া তিন ফুপুর জমি আব্বা কিনে নিতে চান। তাহলে আমাদের জমিগুলো এক দাগে পড়ে। দামও বেড়ে যায়।
এ কারণেই আমাকে পাঠানো হলো ঠেলেঠুলে। এমনিতে লোক সমাগম আমার একদমই ভালো লাগে না। তার ওপর মরা বাড়িতে লোকজনের মেলো ড্রামাটিক আচরণ দেখলে কেন জানি হাসি চেপে রাখতে পারি না। একপাশে ছোকরা হুজুরের দল মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে কোরান তেলোয়াত করছে, অন্য পাশে সেই তেলোয়াতের সুরকে পাল্লা দিচ্ছে কোরাস কান্না; এরই মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি ক্যাবলাকান্তের মতো হাসছি_দৃশ্যটা ভেবে দেখুন একবার!
এবারও অনেক কষ্টে হাসি চেপে রাখলাম। কিন্তু ুধা তো আর চেপে রাখা যায় না। ফুপুর বাড়িতে কোনো মতে খেয়েই বেরিয়ে গেলাম ফিরতি বাস ধরতে। বিকেল চারটায় একটাই বাস মিঠাপুকুর থেকে ফিরে আসে রংপুরে। ওই বাস মিস করা মানেই সেই অজপাড়াগাঁয় আটকে যাওয়া।
জায়গাটার নাম চৌপথি। চার দিক থেকে চারটা পথ এসে মিলেছে এখানে। আশাবাদীরা বলবে মিলেছে, আর হতাশাবাদীরা বলবে, এখান চারটা পথ বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে গেছে চারদিক। যে যাই হোক। আমি চৌপথিতে দাঁড়িয়ে আছি বাসের সন্ধানে। বাস মহাশয়ের টিকির দেখা নেই। মেজাজটা চড়ে আছে। বাড়ির বড় ছেলে হওয়ার হ্যাপা আপনার নিশ্চয়ই জানেন।
আনমনে বসে একটা চায়ের দোকানে তিতকুটে চা খাচ্ছিলাম। পাশের রেডিও থেকে ঘ্যাড়ঘ্যাড়ে শব্দে আর গায়িকার নাঁকি সুরের গান ভেসে আসছে, 'অঞ্জলি লহো মোর...।' মেজাজটা আরও খারাপের দিকে মোড় নেবে নেবে করছে, এমন সময় একটা মূর্তি এসে দাঁড়ালো আমার সামনে।
পরনে লম্বা কালো আলখেল্লা। অবিন্যস্ত চুল, জট পাকানোর প্রাথমিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। একমুখ দাড়িগোঁফ। কাঁধে ঝোলানো একটা ব্যাগ। আর গলায় ঝোলানো একটা আয়না_রুদ্রারে মালার বদলে আয়না! রোদে পুড়ে তামাটে চেহারার কী রকম 'যত্ন' তিনি নেন, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। এই আয়না দিয়ে তবে কী কাজ? প্রথম দেখায় মনে হয়, এই ব্যাটা পাগল, নয়তো ভিুক। কিংবা দুটোই। পাগলা ভিুক। ভাবলাম পয়সা চেয়ে বসবে। কিন্তু আমাকে চমকে দিয়ে অন্য আব্দার করে বসল, 'ভাই দ্যাখেন তো কয়টা বাজে?'
পাগল আর ভিুকদেরও ইদানিং সময় জানার প্রয়োজন পড়ে দেখছি! সময় বলতে যাব, অমনি চোখে পড়ল সেই পাগলের হাতেই একটা জলজ্যান্ত ঘড়ি! হয়তো আমার তাকিয়ে থাকা থেকে মনের কথা আন্দাজ করে নিল সে। 'আর কবেন না বাহে। মোর এই ঘড়িটা হইছে মোর মতো। উল্টাপাল্টা। সেকেন্ডের কাটা ঘোরে মিনিটোত, মিনিটের কাটা ঘোরে সেকেন্ডোত; আর ঘণ্টার কাটা এ্যাত্তো আছতে ঘোরে, উয়াক খুলি থুছু।'
বলেই ঘড়িটা আমার দিকে উঁচিয়ে ধরল। তাকিয়ে দেখি ঘটনা সত্যি। কাটা সব উল্টোপাল্টা করে লাগানো। ঘণ্টার কাটাটাই নেই! 'মোর নাম বাসু পাগলা।' বলেই কোনো দিনও ব্রাশের ষঙ্র্শ না পাওয়া তামাটে দাঁতের পাটি বের করে হাসল। যেন 'পাগল' হওয়াটা বেশ গর্বের!
এবার সত্যিই কৌতুহলী হয়ে উঠলাম। এই যে আমি তুমি আমরা, কী এক অজানা উদ্দেশে ছুটে চলেছি জীবন-রথের সওয়ারী হয়ে, ছুটে চলেছি অদ্ভুত এক গোলকধাঁধার চক্করে পড়ে; তার থেকে বাসু কি খুব আলাদা? তাঁর কি সাধ নেই? নেই বিগত স্মৃতির কষ্ট? অপূর্ণতার আপে? ইচ্ছাপূরণ দেবীর দর্শন পাওয়ার তীব্র আকাঙ্া?
'এভাবে জীবন চলে তোমার?' আমার প্রশ্নে কপালে চিন্তার শতেক ভাঁজ পড়ে তার। ইতিউতি চেয়ে হয়তো খোঁজে উত্তর। এবং এর পরই সেই ীপ্র প্রশ্নবাণ_'তোমাদের কি চলে?'


বিপ্রতীপ-২
: ফ্যান্টাবুলাস! ওয়াও!! দেখেছেন, দেখেছেন, ভাস্কর্যটা দেখেছেন?
_ কোনটার কথা বলছেন? এই যে ফুটপাতের ওপর শুয়ে থাকা হাড় জিরজিরে মানুষটার ভাস্কর্য?
: হঁ্যা রে ভাই হঁ্যা। উফ্, কী বানিয়েছে রে ভাই! মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই।
_ হঁ্যা, ঠিকই বলেছেন। জয়নুল গ্যালারির এবারের প্রদর্শনীর সেরা ভাস্কর্য হবে এটাই। ইদানিং আমাদের কনটেম্পোরারি আর্ট দিনে দিনে বিমূর্ত হচ্ছে।
: অ্যাবস্ট্রাক্ট না কচু। যে যার খেয়াল খুশি মতো অাঁকছে। স্কাল্পচার বানাচ্ছে। কী যে বানায় কিছুই মাথামুন্ডু কিসসু বুঝি না। আপনাকে সত্যি কথাটাই বলে ফেললাম, আপনি আবার আজিজের আড্ডায় গিয়ে এসব ফাঁস করে দিয়েন না।
_ আরে ধুর। ওসব আড্ডা কে কোন কথা বুঝে আর না বুঝে বলে সে আমার জানা আছে। খালি মুখস্ত কয়েকটা বুলি আওড়াবেন, আর কথায় কথায় কান্ট-হেগেল-মার্ক্স- চমস্কি কপচাবেন।
: তা যা বলেছেন। সেসব করেই তো খাচ্ছি। হে হে।
_ তবে যাই বলেন ভাই, এইসব গরিব-দুখী মানুষের ভাস্কর্য-টাস্কর্য দেখলে না আমার মনটা খুব খারাপ হয়।
: হঁ্যা রে ভাই, আমারও। মাঝে মাঝে মনে হয় এদের জন্য কিছু একটা করি। আরে ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবিই পরি আর ইতালি থেকে কিনে আনা সু্যট-টাই, শ্রেণীগত চেতনায় আমরা তো আসলে প্রলেতারিয়েতই।
_ হঁ্যা, ঠিক বলেছে। এখানেই তো মার্ক্স বলেছেন... ইয়ে মানে... কী যেন বলেছেন!
: নান্ না, ঠিকই আছে। বুঝতে পেরেছি।
_ আরে দ্যাখেন দ্যাখেন, আপনার ভাস্কর্যটা তো দেখি নড়ছে!
: আরে তা-ই তো!! কী আশ্চর্য! দেখেছেন কান্ডটা। এতণ আমরা যেটাকে ভাস্কর্য মনে করেছি, ওটা তো আসলে জ্যান্ত একটা মানুষ। ওই ব্যাটা তো উঠেও বসল। ছিঃ কী নোংরা! নাক দিয়ে কেমন গলগল করে সর্দি ঝরছে দেখেছেন। গা গুলিয়ে উঠছে।
_ ব্যাটা যে কয় বছর ধরে গোসল করে না কে জানে।
: আরে ধুর, চলেন তো অন্য জায়গায় যাই। এুনি ব্যাটা নোংরা হাত দিয়ে আমার জামা-কাপর ধরে ভিা-টিক্কা চেয়ে বসবে।
: হঁ্যা হঁ্যা চলেন যাই। ধুর আমরা ভাবলাম কী না এক ভাস্কর্য, অথচ... ছি ছি ছি ছি। চলেন চলেন।

 

রাজীব হাসান
লেখক, কলামিস্ট, সাংবাদিক

মুহূর্তের খবর/২০১৫/অপ





Comment Disabled

Comments